————————এ এফ এম আবদুস সাকির (ছোটন)
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার প্রাণ, ঐতিহ্য আর ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য নাম তিতাস নদী। এই নদীকে ঘিরেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে গড়ে উঠেছে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি আর অর্থনীতির এক সমৃদ্ধ জনপদ। ভাদুঘর থেকে মেড্ডা পর্যন্ত বিস্তৃত এই অঞ্চলে তিতাসের সাথে যুক্ত ছিল ছোট-বড় প্রায় ১৪টি খাল—যেগুলো শুধু পানিপথই ছিল না, ছিল মানুষের জীবনধারা, বাণিজ্য আর যোগাযোগের প্রাণরেখা।
একসময় এই খালগুলো দিয়েই চলত মালবোঝাই নৌকা, কৃষকের ফসল, ব্যবসায়ীর পণ্য আর মানুষের স্বপ্ন। তিতাসকে কেন্দ্র করে ৯টি উপজেলার বাণিজ্যিক যোগাযোগ ছিল সহজ, স্বল্প খরচে আর প্রাণবন্ত। নদী ও খালের তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল গুরুত্বপূর্ণ বাজার, জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্র এবং এক সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি।
কিন্তু কালের বিবর্তনে, উন্নয়ন ও সংস্কারের নামে সেই খালগুলো আজ অনেকটাই হারিয়ে গেছে। কোথাও সেগুলো মরা খালে পরিণত হয়েছে, কোথাও আবার ড্রেইনে রূপ নিয়েছে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, আবর্জনার স্তূপ, দখলদারিত্ব আর দূষণের কালো ছায়া আজ ঢেকে দিচ্ছে আমাদের এই ঐতিহ্যবাহী জলপথকে।
এই বাস্তবতায় ‘তরী বাংলাদেশ’ প্রত্যাশা করে—অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে তিতাস ও এর সাথে সংযুক্ত খালগুলোকে দখলমুক্ত করা হোক, পুনরুদ্ধার করা হোক তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ। পরিকল্পিত ও সঠিক খনন কার্যক্রমের মাধ্যমে ফিরিয়ে আনা হোক নদী ও খালের সেই পুরনো প্রাণচাঞ্চল্য, সেই প্রাকৃতিক নাব্যতা।
কারণ তিতাস শুধু একটি নদী নয়—এটি এই অঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ এবং জীবিকার মূল ভিত্তি। এই নদী ও খালগুলো পুনরুজ্জীবিত হলে তিতাস বিধৌত অঞ্চলে আবারও সারা বছর চাষ হবে আউশ, আমন ও বোরো ধান, সাথে পাট, গম, সরিষা, বাদাম, ধনিয়া, মটরশুঁটি, আলু, বেগুনসহ নানান সবজি। নদী ও খাল থেকে সহজেই গড়ে উঠবে সেচব্যবস্থা, কমবে ঘনঘন বন্যার প্রকোপ, বাড়বে ভূগর্ভস্থ পানির মজুত।
এই জলধারা হবে এক বিশাল পানির রিজার্ভ—যা সারা বছর এই অঞ্চলের পানির চাহিদা পূরণ করবে। নদী ও খালের দু’কূলে আবারও গড়ে উঠবে সবুজ, নির্মল এক প্রাকৃতিক পরিবেশ—যেখানে মানুষ খুঁজে পাবে মুক্ত নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা, প্রকৃতির সাথে নতুন করে বন্ধনের অনুভূতি।
তবে এই কাজ যেন লোকদেখানো না হয়। প্রয়োজন একটি সুপরিকল্পিত, দূরদর্শী উদ্যোগ—একটি স্বপ্নের ব্রাহ্মণবাড়িয়া গড়ার লক্ষ্যে।
এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে
১️⃣ প্রশাসনকে নিতে হবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন উদ্যোগ।
২️⃣ বাড়াতে হবে জনসচেতনতা—নদী ও খাল রক্ষার দায়িত্ব সবার।
৩️⃣ নিশ্চিত করতে হবে কঠোর মনিটরিং—যেখানে নদী বা খালের ক্ষতি হবে, সেখানেই দ্রুত ব্যবস্থা।
তিতাসকে বাঁচানো মানে শুধু একটি নদীকে বাঁচানো নয়—এটি একটি জনপদের ইতিহাস, অর্থনীতি, কৃষি ও ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।
আসুন, আমরা সবাই মিলে আবারও ফিরিয়ে আনি তিতাসের সেই জীবন্ত স্রোত—একটি পরিকল্পিত, সবুজ ও প্রাণবন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া গড়ার প্রত্যয়ে।
এ এফ এম আবদুস সাকির (ছোটন) – সিনিয়র শিক্ষক ও সদস্য নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’

